প্রবন্ধ: বয়ে চলা

        বয়ে চলা

✍️ সত্যান্বেষী দেবাশীষ 



জীবনের সবথেকে তাৎপর্য পূর্ণ হচ্ছে বয়ে চলা। ক্লান্তিহীন বয়ে চলা। সেটা নদীও চলে না। সেও মাঝে মাঝে এঁকেবেঁকে ক্লান্তি প্রকাশ করে। জীবনেও থাকবে ক্লান্তি, গদ্যের মত বিরাম। ক্রান্তি প্রকাশ করে আমাদের শ্যামল পৃথিবী। কোথাও সমতলে, কোথায় সমুদ্রে, কোথায় পর্বত শৃঙ্গে , কোথাও মরুভূমি বা শ্যামল বনানীতে। অনন্ত নয় আমাদের সৌরমণ্ডল। তারপর শুরু হয় গ্যালাক্সি তারও শেষ আছে। অসীম হয় একমাত্র অনুভূতি। হতে পারে আবেগ আকাঙ্ক্ষা ভালোবাসা ইত্যাদি ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে যদি ইচ্ছা নামক বিষয়টাকে অনর্গল যোগান দিতে পারেন তবেই অনুভূতিগুলো হবে অসীম, বাকি সব সসীম। কে কাকে কতটা ভালোবাসে তা দ্বিতীয় কেউ জানে না। হয়তো কিছুটা উপলব্ধি করে । জীবন আপনার কেটেই যাবে তা হতে পারে পৃথিবীর সবার থেকে স্বাচ্ছন্দের বা সব থেকে রুক্ষতার। হতে পারে সব থেকে সম্মানের কিংবা অপমানের। বয়ে চলার মানসিকতা যদি থাকে তবে চালিয়ে নিতে পারবেনই। বয়ে চলার সবথেকে উত্তম উপায় হচ্ছে অপরের মনোভাব দ্বারা নিজেকে মেজরমেন্ট বা যাচাই না করা। যাচাই করছেন তো নিজের উপর আপনি বিরক্ত হতে বাধ্য। জীবনে বিরাম চলে আসবে। সেটা ভালো বা খারাপ উভয়ই হতে পারে। জীবনে বিরামও বয়ে চলার অন্তর্গত। 


একবার এক মুক্তিযোদ্ধার কথার বাতাস লেগে ছিল আমার কানে। ভারতের প্রশিক্ষণ শিবির থেকে বেনাপোলের আশপাশ দিয়ে আসছিলেন যুদ্ধে যোগ দেবার জন্য। পেটে ৩৬ ঘন্টার বুভুক্ষু ক্ষুধা। পায়ে হেঁটে, হানাদার সৈন্যের চোখ এড়িয়ে অবর্ননীয় কষ্ট শেষে সন্ধান পেলেন এক গোপন মুক্তিযুদ্ধ ক্যাম্পের। সেখানেও অপেক্ষা সময়মত ও সীমিত খাবার।৪০-৪৫ ঘন্টা পর রাতের শুরুতে তখনও চাঁদ উঠেনি আকাশে। দুমুঠো শুকনো চিড়ে-একটু বাতাসা। তখন হয়তো পুরো পৃথিবীটা লাড্ডু মনে হতে পারে। সেই গোগ্রাসী ক্ষুধা নিবৃত্তির একমাত্র উপায় দুমুঠো শুকনো চিড়ে-একটু বাতাসা। এত পথের ক্লান্তি, হানাদার বাহিনী, স্টেনগান, গোলাবারুদ, মৃত্যুভয় তাতে শুধু গলা নয়, হৃদয় শুকিয়ে যাবার কথা। সেই খা খা চৈত্রের হৃদয়ের শুকনো চিড়ে ভিজে না। বিড়ির আগুন জ্বেলে পুকুর ডোবার সন্ধ্যান। মজা পুকুর বা ডোবার জলে গামছার কোণে চিড়ে ভিজিয়ে খেতে শুরু করলেন ওই যোদ্ধা। অমৃতসম স্বাদ। কিছুক্ষণ খেতেই অনুভব করলেন পায়খানার গন্ধ। বুঝলেন যেখানে রেখেছেন তা হয়তো খোলা পায়খানার ঢিবির উপর‌। ফেলে দিবেন ফেলে দিবেন ভেবেও ফেলতে পারলেন না। ৪৮ ৫০ ঘন্টার ক্ষুধার কষ্ট, যন্ত্রণা ভুল ফেলে দিতে‌ পারলেন না। নাকের ঘ্রাণ, মুখের স্বাদ, মনের ঘৃণা বিসর্জন দিয়ে দেশপ্রেম, দেশের প্রতি কিছু করার তীব্র বাসনা তাকে ওগুলো খেতে উৎযোগ যোগাল। খেয়ে নিলেন, যুদ্ধ করলেন, দেশ স্বাধীন হলো। এই অপরিমেয় চাওয়া, বয়ে চলার প্রবণতা না থাকলে হয়তো তিনি ক্ষুধায় মারা যেতেন অথবা ভগ্ন শরীরে পড়ে থাকতেন শিবিরে অন্যদের বোঝা হয়ে। দেশের জন্য কিছু করা হতো না।

অথবা ধরুন আমার বা আমাদের কথা, মা যখন রান্না করত এটা খাব না, ওটা খাব না, ভালো হয়নি মশা পড়েছে, পোকা কেন ইত্যাদি ইত্যাদি বাহানা। যখন পরিবারের ছেড়ে শহরে আসি, স্বপাকে বা খালা/মাসির রান্না খাই। তখন পোড়া, নোংরা, পোকা, ভালো মন্দ বলার উপায় থাকে না। প্রথম প্রথম এটা খাই না, ওটা পোকা কিংবা নোংরা‌ একটু সময় বুঝি বয়ে চলতে হবে, সারভাইব করতেই হবে ‌। তখন ওই বিশ্রী বা নোংরা খাবারই অমৃতসম। দিনশেষে এই বয়ে চলার বাসনায় একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বাকি সব ম্লান-ফিকে। এই বয়ে চলার বাসনাই জীবন সুন্দর করতে পারে। বাঁচার জন্য নিত্য নতুন স্বাদ জাগাতে পারে। আপনি অন্যের মনোভাবে নয়, আপনার মনোবলে বাঁচতে পারবেন। বয়ে চলতে পারবেন। আপনি লিখতে পারেন না বলে লেখক নন, বিষয়টি তা নয়। আপনি লিখতে চান না বলেই লেখক নন। আপনি উঁচুতে উঠতে ভয় পান বলে এভারেস্ট জয় করতে পারেননি, তা নয় আপনি এভারেস্ট জয় করতে চাননি বলে পারেননি।


এবার বিশ্বজনীন কথা বাদ দিয়ে আসি আমাদের কথায়, আমার কথায়, আমার জাতি বাঙালির কথায়‌। আমরা পরচর্চা অধিক করি, আমরা অপরকে অধিক গুরুত্ব দেই। সেই অপরের চর্চাকে গুরুত্ব দেই বলেই তারা পেয়ে বসে, পরচর্চা করে প্রশান্তি পায়। আবার সেই গুরুত্ব দেয়াটাই আমার বয়ে চলার পথকে বন্ধুর করে তুলে। এও সত্য অপরের মতামতকে একদম গুরুত্বহীন ভাবলে আপনাকে অনেক ক্ষেত্রে উৎশৃঙ্খল করে তুলতে পারে। সেদিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখবেন। তবে যেখানে কেবল জীবন সারভাইব করার প্রশ্ন সেখানে সকলকে-সবকিছু কে গুরুত্বহীন করে দিন। এই ক্ষেত্রে অমানবিক হলেও কিছু যায় এসে না, তবে মানবিক হতে পারলে অধিক মহত্ত্ব বয়ে আনবে। বিরাম আসুক, ক্লান্তি থাকুক, জীবন বয়ে চলছে, চলবেই।


রচনা - সকাল: ৮.০০; ১ সেপ্টেম্বর, ২০২২, বরিশাল

Comments

Popular posts from this blog

সমান্তরাল

মহা-তীর্থ